ছাপ্পান্নতম অধ্যায়: ছবি তোলার ঝামেলা
লিমেংফেইয়ের হঠাৎ আবির্ভাব সত্যিই ঝাংওয়েইকে কিছুটা বিস্মিত করল। সে কল্পনাও করেনি এই ছেলেটি প্রথম দেখাতেই কোনো কিছু না জেনে-শুনে তার ছবি তুলবে। ঝাংওয়েই ভ্রু কুঁচকে ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘‘লিমেংফেই, দেখা হয়েও অভিবাদন না দেওয়া যাক, কিন্তু এইভাবে ‘ক্লিক ক্লিক’ করে আমার ছবি তোলার মানে কী?’’
‘‘হুঁ, ছবি তুলে রাখতেই তো হবে, না হলে তোমার অপরাধের প্রমাণ কীভাবে রাখব?’’ লিমেংফেই মোবাইলটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে বিজয়ীর হাসি হেসে বলল, ‘‘বিশ্বাস করো বা না করো, আমি এখনই এই ছবি মুরংশুয়ানের কাছে পাঠিয়ে দেব, তখন দেখবে তুমি কী কী সুন্দর কাজ করেছ!’’
সেই দিন, জিংশুয়ান ঝায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুরংশুয়ান ঝাংওয়েইয়ের সঙ্গে নাচলেও, অন্য কোনো পুরুষ অতিথির আমন্ত্রণ গ্রহণ করেনি। এতে লিমেংফেইর মনে প্রচণ্ড অস্বস্তি জন্মায়, এমনকি সে সন্দেহ করতে থাকে মুরংশুয়ান ও ঝাংওয়েইয়ের মধ্যে কোনো বিশেষ সম্পর্ক আছে। সে কারণেই সেদিন রাতে সে ঝাংওয়েইকে উস্কে দেয়, চেয়েছিল ঝাংওয়েইকে ভয় দেখিয়ে পিছু হটাতে। কিন্তু কে জানত, ঝাংওয়েই竟 জানে যে সে দশ বছর বয়সেও বিছানায় প্রস্রাব করত, এবং এই গোপন কথা দিয়েই তাকে ভয় দেখায়।
দশ বছর বয়সে বিছানায় প্রস্রাব করা লিমেংফেইয়ের একেবারে দুর্বল জায়গা। ঝাংওয়েই এই কথা তুলতেই তার সাহস কমে যায়, এমনকি সে একেবারে নিরুত্তর হয়ে যায়, সেদিন宴会上 সে চরম অপমানিত হয়। এই কথা কেবল তার পরিবারের লোকজনই জানত, ঝাংওয়েইর সঙ্গে তার প্রথম দেখা, অথচ ঝাংওয়েই এতো গোপন কথা কীভাবে জানল? তার ধারণা, নিশ্চয়ই মুরংশুয়ান জানিয়েছে।
এ কথা ভাবতেই সে আরও অধৈর্য ও রাগান্বিত হয়ে ওঠে। মুরংশুয়ান যদি তার ব্যক্তিগত কথা ঝাংওয়েইকে বলতে পারে, তবে দুজনের সম্পর্ক নিশ্চয়ই ঘনিষ্ঠ। এতে লিমেংফেইর মনে ঝাংওয়েইর প্রতি বিদ্বেষ আরও বাড়ে, এবং সে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে প্রতিশোধ নেবে বলে।
এবার সে দেখল ঝাংওয়েই একটি মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলছে ও হাসছে; দ্রুত দু’জনের ছবি তুলে নেয়। এই ছবি মুরংশুয়ানকে পাঠালেই, সে নিশ্চিত মুরংশুয়ান তার স্বভাবে ঝাংওয়েইকে একদম ছেড়ে দেবে, কোনো সম্পর্ক রাখবে না।
‘‘তোমার যা ইচ্ছা করো, ছবি পাঠাতে চাও পাঠাও। এতে আমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’’ ঝাংওয়েই ঠাণ্ডা হেসে মুখ ফিরিয়ে লিউ ইউরউকে বলল, ‘‘চলো, আমরা যাই!’’
ইউরউ হ্যাঁ বলে একেবারে ভদ্রভাবে সাড়া দিল, আগে যেমন রাগী ছিল, এখন আর তেমন নয়।
লিউ ইউরউ লিমেংফেইকে দেখে কিছুটা পরিচিত মনে হলো, কিন্তু কোথায় দেখেছে মনে করতে পারল না। তবে লিমেংফেইর বিলাসবহুল গাড়ি আর সুদর্শন মুখ দেখে তার প্রতি অনুরাগ জেগে ওঠে।
‘‘ঝাংওয়েই, এই ছেলেটা কি তোমার বন্ধু?’’ লিউ ইউরউ ঝাংওয়েইর হাত ধরে আস্তে জিজ্ঞেস করল।
‘‘ফালতু ভাবনা বাদ দাও, ছেলেটা এখনো প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি। ও যদি বিয়ের বয়সে পৌঁছায়, তোমার তো বোধহয় চুল পেকে যাবে!’’
ঝাংওয়েইর কথায় লিউ ইউরউর স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
‘‘তুমি কী বলছ? আমি তো শুধু জানতে চেয়েছিলাম, বলিনি যে কিছু করতে যাচ্ছি!’’ লিউ ইউরউ একটু অপ্রস্তুত হয়ে তাড়াতাড়ি বলল।
লিমেংফেই ভেবেছিল অন্য মেয়ের সঙ্গে ঝাংওয়েইকে দেখলে, এবং ছবি তুললে সে নিশ্চয়ই ভীষণ অস্বস্তি বা ভয় পাবে, হয়তো ক্ষমাই চাইবে, নতুবা রাগ করে তার মোবাইল কেড়ে নেবে। কিন্তু লিমেংফেইর ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। ঝাংওয়েই খুব স্বাভাবিকভাবে শুধু একটি কথা বলে চলে গেল, যেন সে লিমেংফেইর কথার কোনো গুরুত্বই দেয় না।
লিমেংফেই কিছুক্ষণের জন্য হতবাক হয়ে গেল, তারপর চিৎকার করে বলল, ‘‘ওই, ঝাংওয়েই, তুমি যেন ভাবো না আমি তোমাকে ভয় দেখাচ্ছি, আমি কিন্তু সত্যিই ছবি পাঠিয়ে দেব।’’
‘‘যা খুশি করো!’’ ঝাংওয়েই শুধু পেছন ফিরে হাত নেড়ে চলে গেল, একবারও ফিরে তাকাল না, যেন লিমেংফেইর কথায় তার কিছু আসে যায় না।
ঝাংওয়েই মুরংশুয়ানের ছদ্মপ্রেমিক সেজে যেতে রাজি হয়েছিল কারণ সে তার প্রথম ক্লায়েন্ট, আর মুরংশুয়ান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আরও একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেবে। ক্লায়েন্টের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে সে রাজি হয়েছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঝাংওয়েই ও মুরংশুয়ানের সম্পর্ক জটিল হয়ে ওঠে। এই ছদ্মপ্রেমিক সেজে থাকা মুরংশুয়ানকে বিব্রত করে তোলে, সে ধীরে ধীরে ঝাংওয়েই থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করে, এমনকি স্বাভাবিক ক্লায়েন্ট সম্পর্কও আর রক্ষা করা যায় না।
যেহেতু ভালো সম্পর্ক আর বজায় রাখা যাচ্ছে না, ঝাংওয়েইরও কোনো লাভ নেই, তাদের সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ নয়, তাই তার আর ছদ্মপ্রেমিক সেজে থাকার প্রয়োজন নেই। এতে শুধু মুরংশুয়ানকে চাওয়াদের শত্রুতা বাড়বে, কিন্তু ঝাংওয়েইর কোনো উপকার হবে না।
‘‘শালা!’’ লিমেংফেই দেখল ঝাংওয়েই দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেছে, রাগে স্টিয়ারিংয়ে ঘুষি মেরে বলে উঠল, ‘‘সে কি ভাবছে আমি সাহস করব না ছবি পাঠাতে, নাকি মুরংশুয়ান দেখলেও তার কিছু যায় আসে না!’’
লিমেংফেইর ধারণা, ঝাংওয়েই এতো নিরুত্তাপ থাকছে হয় এই দুই কারণে—প্রথমত, সে মনে করে, লিমেংফেইর গোপন কথা জানার কারণে লিমেংফেই ছবি পাঠাতে সাহস করবে না। তবে সত্যি যদি সেটাই হতো, ঝাংওয়েই অন্তত সেই কথা তুলত বা দু’জন চুক্তি করত, যাতে গোপন কথা গোপনই থাকে। আর দ্বিতীয় কারণ, হয়তো মুরংশুয়ান ও ঝাংওয়েই আদৌ প্রেমিক-প্রেমিকা নয়, তাই সে ভয় পায় না। এই দ্বিতীয় কারণটিই লিমেংফেই সবচেয়ে বেশি চায়, কারণ তাহলে মুরংশুয়ানকে সে নিজের প্রেমিকা করতে পারবে।
এ কথা ভাবতেই লিমেংফেইর মনে আরও উত্তেজনা বাড়ে, সে চায় ঝাংওয়েইকে সামনে এনে জিজ্ঞেস করে জানুক, তারা দু’জনের সম্পর্ক আসলে কী। সে ডান মুষ্টি তুলে স্টিয়ারিংয়ে আঘাত করে, উত্তেজনায় বলে, ‘‘না, আমাকে অবশ্যই এই ব্যাপারটা পরিষ্কার করতে হবে, ঝাংওয়েইকে খুঁজে বের করে জিজ্ঞেস করতেই হবে, ও আর দিদিমার মধ্যে কী সম্পর্ক!’’
লিমেংফেই গাড়ির দরজা খুলে দৌড়ে বেরিয়ে ঝাংওয়েই চলে যাওয়ার দিকে ছুটে গেল। কিন্তু রাস্তার শেষ মাথায় গিয়ে কোথাও ঝাংওয়েইকে দেখতে পেল না। আশেপাশে অনেকক্ষণ খুঁজেও কিছুই পেল না, অবশেষে নিরাশ হয়ে খোঁজা ছেড়ে দিল।
এসময় ঝাংওয়েই ও লিউ ইউরউ ইতিমধ্যে এএইট গাড়ির পিছনের সিটে বসে পড়েছে। চৌ প্যাংজি এখনো গাড়ি চালাচ্ছে, আর উ চিয়েন সামনের সিটে বসে আছে। ঝাংওয়েই অলসভাবে সিটে হেলান দিয়ে এমনভাবে বসে আছে যেন গাড়ির মালিক সে নিজেই।
‘‘ঝাংওয়েই, ওই ছোট帅 ছেলে আমাদের ছবি তুলল কেন? ও তোমার কী হয়?’’ লিউ ইউরউ চুলের একগুচ্ছ কানের পেছনে সরিয়ে বড় বড় চোখে জিজ্ঞেস করল।
‘‘তুমি কেমন কথা বলছ, আমি আর এক ছেলের কী সম্পর্ক হতে পারে?’’ ঝাংওয়েই অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিল।
‘‘কেন সম্পর্ক থাকবে না? ধরো, কোনো মেয়ের জন্য তোমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা, তাই তো ও আমাদের ছবি তুলল!’’ লিউ ইউরউ বলল।
‘‘কি সব আজেবাজে কথা বলছ! ছেলেটা এখনো প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি, আমার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে!’’
‘‘এখন তো সবাই বলে বয়স বড় কথা নয়, উপরন্তু ওই ছেলেটা দেখতে তোমার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর।’’
‘‘বলো তো, তুমি কিভাবে ওই ছেলেটার কথাই ভাবছ! মেয়েদের মতো সুন্দর ছেলেদের ভরসা নেই, আমি আর প্যাংজি ভাইয়ের মতো পুরুষরাই আজীবন ভরসা।’’
‘‘ঝাংওয়েই ঠিকই বলেছে, শুধু দেখতে ভালো হলে হবে না, আসল কথা মেধা আর যোগ্যতা থাকতে হবে। যেমন আমি,’’ চৌ প্যাংজি নিজের গুণগান করল।
‘‘চুপ করো তো, পাঁচ লক্ষ টাকা খরচ করে গাড়ি ভর্তি নকল মাল কিনেছ, আবার নিজের গুণগান করছ! নিজের দশা তো একবার দেখো,’’ উ চিয়েন তির্যক চোখে তাকিয়ে খোঁচা দিল।
উ চিয়েনের কথায় যেন এক বালতি বরফের জল ঢেলে দেওয়া হলো চৌ প্যাংজির ওপর, সে চুপচাপ গাড়ি চালাতে লাগল, আর কোনো বড়াই করার সাহস পেল না।