চুয়ান্নতম অধ্যায়: প্রতিশ্রুতির কথা কখনো মিথ্যে হয় না
যখন দোকানের কর্মচারী পুরো ঘটনাটা খুঁটিনাটি জানিয়ে দিল, তখন আয়োকি সি-র সারা দেহ কাঁপতে লাগল।
এই পৃথিবীটা কেন এমন?
কেন সেইসব মেয়েরা, যাদের এখনই ফুল হয়ে ফোটার কথা, এত নিষ্ঠুর হয়ে উঠল?
তারা কি বোঝে না, তাদের কথাগুলি কতটা ক্ষতিকর হতে পারে?
আয়োকি সি মাটিতে বসে থাকা তিনটি মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখল—তারা চুপচাপ অশ্রু ঝরাচ্ছে, যেন তারাই সবচেয়ে বড় নির্যাতিত। তার গলা বরফের মতো ঠান্ডা, ‘‘তোমরা কি পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে এভাবেই কথা বলো? হ্যাঁ?’’
‘‘আমরা ভুল করেছি, আমরা সত্যিই ভুল করেছি, আর কখনও করব না...’’ লম্বা চুলের মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘‘দুঃখিত’’।
‘‘তাদের চেয়ে একটু ভালো পোশাক পরলেই, অর্থাৎ...’’
আয়োকি সি-র কণ্ঠস্বর আরও উঁচু হয়ে উঠল, ‘‘তোমরা কি ভাবো, এটাই যথেষ্ট কারণ কাউকে নিয়ে বাজে কথা বলার?
তোমাদের মতো আবর্জনা বারবার নির্যাতন করলে কেউ আর কথা বলবে না, তবেই কি সে বোবা হয়ে যাবে?
কেউ যদি সহজ-সরল হয়, তবে কি সে কেবলই অপমান আর নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তু হবে?
আয়োকি সি যত বলছিল, ততই উত্তেজিত হয়ে পড়ছিল, তার আঙুল তিনটি মেয়ের দিকে ওঠা-নামা করছিল, ‘‘ভালো...
তোমরা কি মানুষকে নির্যাতন করতে ভালোবাসো? মনে করো নিজেকে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তাই যা খুশি তাই করবে?
এখন তোমরা সবাই আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসো, সোরাকে ক্ষমা চাও।
যে ক্ষমা চাইবে না, তাকে আমি দেখিয়ে দেব কীভাবে নির্যাতন কাকে বলে, বুঝেছ?
আয়োকি সি তাদের দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকাল, এক বিন্দু ছাড়ও নেই।
তিনটি মেয়ে একে-অপরের দিকে তাকাল, আবার চারপাশে জড়ো হওয়া মানুষের দিকে সাহায্যের আশায় চাইল, কিন্তু দেখতে পেল শুধু উৎসুক চোখ আর উঁচু করা মোবাইল ফোন—কেউ কেউ আয়োকি সি-কে উৎসাহ দিচ্ছে।
তারা নিরুপায় হয়ে আস্তে আস্তে সোরার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো, মৃদু স্বরে বলল, ‘‘দুঃখিত, আমরা ভুল করেছি।’’
‘‘তোমরা কি বোবা?’’ আয়োকি সি দোকানির কথা নকল করে, ঝুঁকে পড়ল, কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘‘শুনতে পাচ্ছি না, তোমার গলা কি এতই ছোট?’’
‘‘দু...দুঃখিত! আমরা ভুল করেছি!’’ তিনটি মেয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল।
আয়োকি সি শুধু ঠান্ডা চোখে তাদের একবার দেখল।
‘‘সোরা...’’ সে পেছনে ফিরে, কান্নায় ভেঙে পড়া সোরার দিকে তাকাল, দীর্ঘশ্বাস ফেলল, কঠিন মুখে অদ্ভুত কোমল হাসি ফুটে উঠল, সে তার মাথায় আস্তে করে হাত রাখল, ‘‘ভয় পেও না... এবার থেকে আমি তোমার পাশে থাকব। আমরা একে-অপরের আঙুলে আঙুল রাখলাম, প্রতিশ্রুতি দিলাম, তোমাকে আমি রক্ষা করব। তুমি কেন ডাকলে না আমাকে একটু আগেই, বোকার মতো...’’
সোরা আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল আয়োকি সি-র বুকে, শক্ত করে আঁকড়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল, ‘‘সি...সি...’’
আয়োকি সি অনুভব করল, তার বুকে জড়িয়ে থাকা ছোট্ট শরীরটা কতটা দুর্বল, তার কান্না কতটা বিদারক, সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, তার রুপালি চুলে হাত বুলিয়ে দিল, পিঠে আলতো করে হাত রাখল—সোরার দুর্বল পিঠের ওপার থেকে তার হাতের তালুতে সে টের পেল অস্পষ্ট, ক্ষীণ এক হৃদস্পন্দন।
আয়োকি সি সোরাকে বুকে জড়িয়ে রেখে মুখ ঘুরিয়ে এখনও মাটিতে হাঁটু গেড়ে কাঁদতে থাকা তিনটি মেয়ের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলল, ‘‘আজকের ঘটনা যেন তোমাদের চিরকাল মনে থাকে, যেন কখনও ভুলতে না পারো।
এরপর কখনও কাউকে নির্যাতন করার ইচ্ছে হলে, আমার এই মুখটা মনে করো।’’
সে তিনটি মেয়ের আতঙ্কিত চোখের দিকে চেয়ে ধীরে ও সুস্পষ্ট উচ্চারণে বলল, ‘‘আর যদি একবারও দেখি...
মনে রেখো, কেবল একবার—আমি দেখিয়ে দেব, নির্যাতন কাকে বলে, বুঝেছ?’’
তিনটি মেয়ে মাথা নেড়ে, চোখ মুছে বলল, ‘‘মনে রেখেছি।’’
‘‘প্রতিশোধ নিতে চাও, বা যা খুশি করো, আমার ওপর করো।’’ আয়োকি সি কঠিন মুখে বলল, ‘‘আর তোমাদের সঙ্গে যারা সোরাকে নির্যাতন করেছে, তাদেরও বলে দিও, যেন আর কখনও ওকে আঘাত করার সাহস না দেখায়। আগের কথা আর তুলতে চাই না, কিন্তু এবার থেকে মনে রেখো, সোরার একটি ভাই আছে, তার নাম আয়োকি সি।
মনে রেখেছ তো? মুয়াং উচ্চমাধ্যমিক স্কুল—আয়োকি সি!’’ তার চোখে ছিল হিংস্র দৃঢ়তা।
তিনটি মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাথা নেড়ে বলল, ‘‘মনে রেখেছি।’’
‘‘চলে যাও।’’
সে ঠান্ডা স্বরে গালি দিল, এক মুহূর্তও তাদের জন্য আর সময় অপচয় করতে চাইল না।
তিনটি মেয়ে হোঁচট খেতে খেতে উঠে দাঁড়াল, মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে পালিয়ে গেল।
আয়োকি সি বুকের মাঝে এখনও কাঁদতে থাকা সোরার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘‘সোরা, ওরা চলে গেছে...’’
সোরা এখনও কাঁদছিল, যেন বছরের পর বছর জমে থাকা কান্না একদিনেই শেষ করে দিতে চায়।
আয়োকি সি চারপাশে ভিড় করে থাকা, মোবাইল ধরে রাখা মানুষের দিকে তাকাল, তার মুখে ঠান্ডা রাগ, ‘‘যখন ওর সাহায্য দরকার ছিল, তখন তোমরা শুধু দাঁড়িয়ে থেকে ভিডিও তুললে? কেউ কি একটু এগিয়ে এসে সাহায্যের কথা ভাবলে না? এখনো কি কিছু ভিডিও করতে চাও? তোমরা নিজেরাই নিজেদের ভিডিও করো না, দেখে নাও, তোমাদের মনে এখনও আলো-উষ্ণতা আছে কি না? হ্যাঁ?’’
তার রাগী প্রশ্নে সবাই একে একে মোবাইল নামিয়ে ফেলল, কেউই আর সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে সাহস পেল না, তার কঠিন দৃষ্টির সামনে সবাই ছড়িয়ে পড়ল, ফিসফিসে আলোচনা চলতে লাগল, যদিও প্রত্যেকে সাবধানে গলা নামিয়ে দিল।
‘‘এত রাগারাগি করছে কেন... দেখলেই বোঝা যায় একটা উচ্ছৃঙ্খল ছেলে...’’
‘‘এখন যা-ই দেখাক, কে জানে, পিছনে নিজেও কারও ওপর অত্যাচার করে কি না...’’
‘‘ঠিক তাই তো... এই চেহারা দেখলেই বোঝা যায়, ভালো মানুষ না...’’
এই কথাগুলো আয়োকি সি-র কানে গিয়ে পৌঁছাল।
এই শীতল বাস্তবতার কথা ভেবে তার মন ভারী হয়ে উঠল।
তবু সে এই ভিড়ে মিশে যেতে চাইল না।
সে জানে, হয়তো কোনোদিনও কারও পথ দেখাবার বাতিঘর হতে পারবে না।
হয়তো কোনোদিনও নায়ক হতে পারবে না, বিপদে পড়া মানুষকে বাঁচাতে পারবে না।
তবু সে যা পারবে, তা হলো—নিজের ভালোবাসার মানুষকে রক্ষা করা, নিজের মুষ্টি, দাঁত দিয়ে, প্রিয়জনের জন্য একটি উজ্জ্বল বাস্তবতা তৈরি করা—যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন এভাবেই চলবে।
আয়োকি সি পারবে না বিশ্ববিখ্যাত কোনো প্রবন্ধ লিখতে, পারবে না এমন কোনো গান গাইতে যা মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, তার আছে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা মুষ্টি আর সহ্যশক্তি।
উচ্ছৃঙ্খল ছেলে?
হ্যাঁ, আমি হবই সে রকম, শুধু বদমাশদের জন্যই!
তোমরা আমাকে স্বীকার করো বা না করো, আমার জীবন নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই, এটাই যথেষ্ট!
আয়োকি সি জীবনে প্রথমবারের মতো নিজের লক্ষ্য স্পষ্ট বুঝতে পারল, প্রথমবারের মতো বুক উঁচিয়ে মেনে নিল, সে ঠিক সেই ‘উচ্ছৃঙ্খল ছেলে’—এই পরিচয়।
সোরার হৃদয়বিদারক কান্নার সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের রক্ত গরম হতে থাকল, আগুনের মতো।
‘‘সোরা, আর ভয় পেয়ো না... এবার থেকে আর কখনও ভয় পেয়ো না...’’ আয়োকি সি তার থুতনি সোরার ছোট্ট মাথায় রাখল, চোখ বন্ধ করল, হাতের তালুতে স্নিগ্ধভাবে সোরার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল।
যতক্ষণ না সোরা কান্না থামিয়ে নিঃশব্দে কাঁপতে লাগল, আয়োকি সি তখন তার মুখের অশ্রু মুছে, মৃদু হাসি নিয়ে তার চোখে তাকিয়ে বলল, ‘‘এখনও কি ভয় লাগছে?’’
সোরা আয়োকি সি-র দিকে তাকিয়ে কান্না আস্তে আস্তে থামিয়ে, নিজেই চোখ মুছে তার চোখে চাইল, কণ্ঠস্বর কর্কশ, ‘‘আর ভয় নেই...’’
‘‘সি...’’ সোরা মাথা তুলে কাতর স্বরে বলল, ‘‘তুমি কি কখনও আমার প্রতি ঘৃণা দেখাবে, তাদের মতো?’’
‘‘কখনও না।’’ আয়োকি সি নিঃশঙ্কভাবে উত্তর দিল।
সোরা-র বরাবরের শীতল মুখে এখনও অশ্রু ঝরছে, ছোট্ট নাক বেয়ে কান্নার ফোঁটা ঠোঁটের কোণে গড়িয়ে পড়ল, সে ঠোঁট নড়িয়ে শেষমেশ হাজারো কথা একটিমাত্র হাসিতে প্রকাশ করল—যেমন হাসি তার মুখে কখনও দেখা যায়নি, ‘‘ধন্যবাদ... সি... ধন্যবাদ।’’
‘‘বোকা... আর কোনোদিন আমাকে ধন্যবাদ দেবে না।’’ আয়োকি সি তাকে জড়িয়ে ধরে তার অশ্রুসিক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসল, ‘‘আমি কথা দিয়েছি, তোমাকে আজীবন রক্ষা করব।
আমি আয়োকি সি, কোনওদিনও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করি না।’’
———
পুনশ্চ: সম্প্রতি রাত বারোটার পর একবার, দুপুর বারোটায় আরেকবার আপডেট দিচ্ছি। সাথে ভোট চাই, ভালোবাসি তোমাদের~